
দীপক কুমার সরকার, বগুড়া : প্রায় পাঁচ দশক আগে নির্মিত বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের চককল্যানী গ্রামের বাঙালী নদীর তীরে অবস্থিত কাটাখালি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হঠাৎ ধসে পড়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বাঁধটি ভাঙ্গন শুরু হয়। প্রবল পানির চাপে প্রায় ৫০ মিটার বাধের অংশসহ সংলগ্ন সড়ক, উপড়ে যায় গাছপালা, আর নদীতে বিলীন হয়ে যায় কৃষিজমির বড় অংশ ভেঙে পড়ে। ফলে আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামে দেখা দেয় বিপর্যয়। তবে এক্ষেত্রে প্রশাসনের অবহেলাকেই অনেকটাই দায়ী করছেন। এবং দ্রুত এই বাধের পুনঃনির্মাণ করার জন্য প্রশাসনের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা স্থানীয়রা।
জানা যায়, আগে প্রতি বছর বড় বড় বন্যা হতো, ফলে বাঙালি নদীর পানি কাটাখালী খাল দিয়ে প্রবেশ করে বিলজয় সাগর, জয়লা, আওলাকান্দি, জালশুকা, কইগাতী, যুগিগতি, রুদ্রবাড়িয়া সহ আশেপাশের সকল এলাকায় বন্যা হয়ে যাওয়ার কারনে তারা জমিতে চাষাবাদ করতে পারতোনা। সেখানে পাকিস্তানি আমলে চক কল্যানী গ্রামে প্রায় ১’শ মিটার বাধ নির্মাণ করা হয়েছিল। বিগত ৩০ বছর আগে সেই বাধ ভেংগে গিয়ে দুর্ভোগে পড়েছিল ঐ এলাকার হাজার হাজার মানুষ। পরে এলাকার মানুষ সরকারী সহায়তায় চক কল্যানী গ্রামে একটা বাধ নির্মাণ করে। আবার ওই সকল এলাকার জমিতে প্রয়োজনীয় পানির চাইতে অতিরিক্ত পানি হলে সেটি খাল থেকে বের হওয়ার জন্য বাধের নিচে পাইপ সংযোগ দেয়া ছিল। হঠাৎই সেই পাইপের মুখ বন্ধ থাকায় চলতি মৌসুমে অতি বর্ষণের কারণে বাঁধের দক্ষিণ অংশে পানি জমে যায়।
শুক্রবার(২৫ জুলাই) বিকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ধসে যাওয়া বাঁধের ফাঁক দিয়ে তীব্র বেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এই বাঁধের ওপর নির্ভর করেই এলাকার মানুষ কৃষিপণ্য পরিবহন, চলাচল ও যোগাযোগ কার্যক্রম চালাতেন। এখন তা ভেঙে যাওয়ায় অনেকেই সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন। বাঁধটি দ্রুত মেরামত করা না হলে বন্যার পানিতে গোটা এলাকা প্লাবিত হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাঙালী নদীর উত্তরে নির্মিত এ বাঁধের দক্ষিণে রয়েছে বিল জয়সাগর খাল। এই খাল দিয়ে আগে অন্তত ২০টি গ্রামের পানি নিষ্কাশন হতো। কিন্তু স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পর সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বর্ষায় প্রায় এক হাজার একর জমি পানিতে নিমজ্জিত থাকে। জলাবদ্ধতা দূর করতে এক দশক আগে এলাকাবাসী বাঁধের নিচে পাইপ স্থাপন করেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা স্লুইস গেট স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে প্রশাসনের কাছ থেকে শুধু আশ্বাসই মিলেছে বলে অভিযোগ।
তারা বলেন, এবারের বর্ষায় জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন পাইপ স্থাপন করারার জন্য সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে অর্থ উত্তোলন করা হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই কাজে মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় বাঁধটি ধসে পড়ে। সরকারি প্রকল্পের ২ লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে চারটি পাইপ বসানো হয়েছিল। তার বাইরেও এলাকাবাসীর কাছ থেকে আরও ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে অব্যবস্থাপনা থাকায় কাজ শেষ হয়নি, বরং বাঁধই ধসে যায়।
চককল্যানী গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন জানান, ধসের ফলে তার প্রায় পাঁচ বিঘা ফসলি জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। এসব জমিতে শাকসবজি চাষ করা হয়েছিল। দোকানি আবুল কাশেম বলেন, তার দোকানটি বাঁধসংলগ্ন ছিল। ধসের সময় কিছু মালামাল সরাতে পারলেও দোকানটি ভেঙে পড়ে এবং পানিতে ভেসে যায়। স্থানীয় কারখানার মালিক রিপন আহমেদ জানান, তার জালি টুপি তৈরির কারখানা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। এতে তার পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ভাঙন এলাকার বাসিন্দারা বলেন, কাটাখালী বাধে একটি সুইচগেট নির্মাণের জন্য বেশ কিছুদিন আগে আমরা মানববন্ধন করেছিলাম। এমনকি পানি উন্নয়ন বোর্ড পর্যন্ত বিষয়টি অবগত করেছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখনো তার কোন কার্যক্রম শুরু হয়নি। তাই উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যেন দ্রুত আমাদের এই সমস্যা সমাধান করে স্বাভাবিক চলাচল ও নির্বিঘ্নে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আশিক খান বলেন, কাটাখালির ওই বাঁধ ভাঙনের খবর পেয়েছি,
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে যেন দ্রুত সকল কিছুর ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে ওই ভাঙন এলাকার বাধ নির্মাণ নিয়ে বগুড়া পানি উন্নয়ক বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক জানান, শেরপুর উপজেলার বাঙালি নদীর ওই অংশের ভাঙনের তথ্য জানতে পেরেছি, ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।







