১৩ ডিসেম্বর বগুড়ার চার উপজেলা হানাদার মুক্ত হয়


দীপক কুমার সরকার, বগুড়া : ১৩ ডিসেম্বর, এ দিনেই বগুড়া জেলার ৪ উপজেলা হানাদার মুক্ত হয়েছিল বলে যুদ্ধে অংশ নেয়া মুক্তিকামী যোদ্ধাদের দাবী। সে থেকেই এ দিনকে ‘বগুড়া হানাদারমুক্ত’ দিবস হিসেবে আখ্যা দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে শহরের ফুলবাড়ী এলাকায় পাক বাহিনীর ঘাঁটি আক্রমণের মধ্য দিয়ে বগুড়াকে হানাদার মুক্ত করা হয়। এর আগে টানা তিনদিন মিত্রবাহিনীর সহায়তায় বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

কিন্তু স্বাধীনতার ৫১ বছর পরও বগুড়া মুক্ত দিবস নিয়ে মতভেদ দূর হয়নি। কারো মতে ১৩ ডিসেম্বর আবার কারো মতে ১৮ ডিসেম্বর হলেও বাদ যায়নি ১৫ ও ১৭ ডিসেম্বর। বগুড়া মুক্ত দিবস নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোন দালিলিক কোন ব্যাখা পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে পৃথক পৃথক তারিখ উল্লেখ করেছেন বগুড়ার বিভিন্ন পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধারা। তবে একাত্তর বিজয়ের সেইক্ষণ নামক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থের ১০০ নং পৃৃষ্টায় আত্মসমর্পণ: বগুড়া অধ্যায়ে লিখিত কিছু ডকুমেন্ট পাওয়া গেছে তাতে দেখা গেছে ১৮ ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করছে।

বগুড়া জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মমতাজ উদ্দীন জীবিত অবস্থায় দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, তারিখটি তার মনে না থাকলেও দিনটি ছিল শুক্রবার। সেই অনুযায়ী ১৯৭১ সালে শুক্রবার ছিল ১৭ ডিসেম্বর।

তবে বগুড়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ও সাবেক পৌর চেয়ারম্যান এড. রেজাউল করিম মন্টু বলেছিলেন ১৩ তারিখেও শহরে শেলিং, গোলাগুলি চলছিল। তিনি ১৫ ডিসেম্বর বগুড়া মুক্ত হওয়ার দাবি করেন। বগুড়া হানাদার মুক্ত দিবস নিয়ে একাধিক বার কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বললে তারা ১৩ ডিসেম্বরই বগুড়া মুক্ত দিবস হিসেবে স¦ীকৃতি দেয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া তথ্যমতে, ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর বগুড়া শহর হানাদারমুক্ত হয়। তখন বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা। এর আগে ১০ ডিসেম্বর থেকে হানাদারবাহিনীকে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মরণ কামড় দিয়েছিল। আকাশে মিত্রবাহিনীর বোমারু বিমান, মাটিতে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর অভিযানে দিশাহারা হানাদার বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

২ ডিসেম্বর সারিয়াকান্দি থানা প্রথম হানাদারমুক্ত হওয়ার পর একে একে বগুড়ার সোনাতলা, গাবতলী, ধুনট হানাদারমুক্ত হয়। এর পর একসঙ্গে ১৩ ডিসেম্বর বগুড়া সদর, কাহালু, নন্দীগ্রাম, দুপচাঁচিয়াথানায় পাকবানীর পতন ঘটে। অবশ্য শিবগঞ্জ, আদমদীঘি, শেরপুর ১৪ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয়।

এর মধ্যে নন্দীগ্রাম আশার পথে কাহালু থানার কড়ই নামুজা গ্রামে পাক হানাদারদের সাথে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ২৮ জন পাক সেনা নিহত হয়। অতঃপর নন্দীগ্রাম থানার দায়িত্ব নিয়ে তিনি ডেপুটি কমান্ডার বদিউজ্জামান মন্টু, টিম কমান্ডার আজিজুল হক, সিরাজুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীরসহ আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে ৭১ এর ৯ই ডিসেম্বর নন্দীগ্রামে প্রবেশ করে। ৩ দফায় নন্দীগ্রামে যুদ্ধের কাজ শুরু হয়। প্রথমে ১১ই ডিসেম্বর নন্দীগ্রাম পৌর এলাকার মন্ডল পুকুর সিএন্ডবি’র ব্রীজের পার্শ্বে থেকে পাকসেনা ও তাদের দোসরদের উপর আক্রমন করে। ওইদিন রণবাঘা বড় ব্রীজের নিকট স্থানীয় রাজাকারদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়।

অপর দিকে, বেলঘরিয়ায় পাকসেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধে পূর্ণখান নামে একজন পাকসেনা আতœসমর্পণ করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে পাকসেনা ও তাদের দোসররা ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করে। তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে মানুষের হ্নদয়ে।

জেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোত্তালিব মানিক জানান, আসলে ৮ ডিসেম্বর বিজয় এসেছে বগুড়ায়; কিন্তু অফিসিয়ালি ১৩ ডিসেম্বর বগুড়া মুক্ত ঘোষণা হয়। তিনি আরও জানান, ২ ডিসেম্বর তারা সারিয়াকান্দি ও গাবতলী থেকে ১১ হানাদার সদস্য আটক করেন। এর মধ্যে ৫ জন মারা যান। ৬ জনকে মিত্রবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। দল নিয়ে ঝড়ের গতিতে তারা বগুড়ায় এসে পৌঁছেন ৮ ডিসেম্বর। ফুলবাড়ী এসে হানাদারদের সঙ্গে তুমুল লড়াইয়ের পর তারা শহরে প্রবেশ করে আবার ফিরে যান ফুলবাড়ি কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়াত নেতা মখলেসুর রহমানের বাড়িতে। তিনি বলেন, যারা বগুড়া মুক্ত দিবস নিয়ে বিতর্ক করছে তারা আসলে শহরে প্রবেশ করেছে অনেক দেরিতে। ১৩ তারিখেই মিত্র বাহিনী বগুড়া শহর পুরো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর প্রকৌশলী আওরঙ্গজেব এর নেতৃত্বে সারিয়াকান্দি থেকে পৌঁছায় শহরে।

মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম -মুক্তিযুদ্ধ-৭১ জেলা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড খন্দকার রেজাউল আলম মোঃ বেলাল বলেন, ১৩ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধার আরেক একটি দল পাক সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য শিবগঞ্জ থেকে বগুড়া শহরে ঢুকেছিল। তার পরিষ্কার মনে আছে হিলি সীমান্ত থেকে বগুড়ায় ঢোকার পর মহাস্থানে মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়েছিলেন। তার দাবি মতে পরাজিত হানাদার পাক বাহিনী বৃন্দাবনপাড়ায় নয়, শহরের এডওয়ার্ড পার্কে আত্মসমর্পণ করেছিল।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার রুহুল আমিন জানান, তারা ওই সময় হানাদারমুক্ত সোনাতলায় অবস্থান করছিলেন। ওই সময়ের বহু স্মৃতি অনেকের স্মরণে নেই। তবে বগুড়া শহরে সকাল থেকে হানাদার বাহিনীর ওপর মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনী তীব্র আক্রমণ শুরু করে। মাগরিবের নামাজের পর ফটকি ব্রিজের কাছে মিত্রবাহিনী তাদের পাক হানাদারবাহিনীর নিহতদের লাশ ও আহতদের পৃথক করতে বলেন। এর পর মিত্রবাহিনী তাদের স্থান ত্যাগ করতে বলে। পাকবাহিনী মুক্তি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে নারাজ। তাদের কাছে মুক্তিবাহিনী আন্তর্জাতিক বাহিনী নয়, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী নিয়মিত বাহিনীর কাছে তারা আত্মসমর্পণ করতে চায়। এ ছাড়া তাদের ভয় ছিল- মুক্তি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে তারা তাদের মেরে ফেলতে পারে। তারা সেখান থেকে পাকবাহিনীর ১৩৭ জনকে আহত অবস্থায় এবং ৩৭ জনের মৃতদেহ পেয়েছেন। ১৩ ডিসেম্বর বিকালে ঘোষণা দেওয়া হয়- বগুড়া শহর হানাদারমুক্ত। ১৪ ডিসেম্বর সকালে তারা জনশূন্য শহর দেখতে পান।

সবার মতে ১৯৭১ সালে ১০ ডিসেম্বর ভোরে মিত্রবাহিনী (ভারতীয় সেনা) এর ৬৪ মাউন্টেন রেজিমেন্ট ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার প্রেম সিংহ এক ব্রিগেড সৈন্য নিয়ে বগুড়া শহরের ৩ কিলোমিটার উত্তরে নওদাপাড়া-চাঁদপুর ও ঠেঙ্গামারা গ্রামের মধ্যবর্তী স্থান লাঠিগাড়ি মাঠসংলগ্ন বগুড়া-রংপুর সড়কে অবস্থান নেয়। আর্টিলারি ডিভিশন সেখানে বাঙ্কার খনন করে অবস্থান নেয়। বগুড়া শহরে পাক সৈন্যদের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে শহরে অভিযান পরিচালনার জন্য ফ্রন্ট ফাইটার গোর্খা বাহিনীর সৈন্যরা ট্যাংক নিয়ে শহর অভিমুখে মার্চ করে।

মূলত; পাক হানাদার বাহিনীদের সাথে মুক্তিকামীদের সাথে ১০, ১১ ও ১২ ডিসেম্বর তুমুল যুদ্ধ হয়। ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যার দিকে পাক হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে বলে সংবাদ পাওয়া গেলে বগুড়াবাসীসহ মিত্রবাহিনীর শিবিরে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ১৩ ডিসেম্বর রাতের পর থেকে বুকভরা শ্বাস ফেলে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষ। হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার, আলবদর, আলসামস ও মুসলিমলীগের পান্ডারা বগুড়ার বিভিন্ন গ্রামে ও বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করে। পরে তারা ধীরে ধীরে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। এর পর দীর্ঘ সময় পর ফুলবাড়ীতে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের স্মরণে ২০০৫ সালে ‘মুক্তির ফুলবাড়ী’ নামে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সংবলিত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।