জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা ঘোষিত শিমলা পার্ক, এখন প্রয়োজন সকলের দায়িত্বশীল আচরণ


রাপ্র ডেস্কঃ রাজশাহী শহরজুড়ে সবুজের সমারোহ থাকলেও শিমলা পার্ক এলাকার সবুজটা যেন একটু আলাদা। এ এলাকার সবুজটা মনে হয় অনেক বেশি মায়াবী। সর্বত্র বিস্তৃত ঘন সবুজ গাছপালায় আচ্ছাদিত শিমলা পার্ক শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেই ভরপুর নয়, এটি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্য প্রাণীরও প্রিয় আবাসস্থল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বার্ড ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, বছরের অধিকাংশ সময় এখানে ২০০টিরও বেশি প্রজাতির পাখির সমাগম ঘটে। চখাচখি, কবুতর, ঘুঘু, কুবো, আবাবিল, টিটি, বাটান, পানকৌড়ি, গাঙচিল, বক, কাঠঠোকরা, ফিঙে, টিয়া, মাছরাঙা, শালিক, দোয়েল, মৌটুসি, চঁড়ুই, খঞ্জনা, বুলবুলি, বেনেবউ, জলমুরগি, কোকিলসহ আরও অসংখ্য পরিচিত ও অপরিচিত দেশি-বিদেশি পাখি বিশেষ করে বর্ষা ও শীতকালে এখানে দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া এখানে রয়েছে খরগোশ, কাঠবিড়ালি, ইঁদুর, খাটাশ, গন্ধগোকুল, মেছোবিড়াল, বেজি, শিয়াল এবং বিভিন্ন প্রজাতির বাদুড়সহ ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। পাশাপাশি রয়েছে ২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, যেমন কচ্ছপ, গিরগিটি, টিকটিকি, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ এবং ১৩ প্রজাতির উভচর প্রাণী।
এ সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন্যপ্রাণী উপদেষ্টা পরিষদের সর্বশেষ (৪১তম) সভায় রাজশাহী জেলার পদ্মাচরের শিমলা পার্ককে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে ঘোষণার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সভায় বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলার বড়বিলা বিল এবং রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আওতাধীন বাবুডাইং পর্যটন ও পিকনিক স্পটকেও বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে ঘোষণার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
শিমলা পার্কের বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন অংশ থেকে জেলা প্রশাসকের বাংলোসংলগ্ন শহর রক্ষা বাঁধ পর্যন্ত প্রায় ১৭ একর এলাকা এই বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হবে। জীববৈচিত্র্য শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রাজশাহীর মতো একটি দ্রুত বর্ধনশীল নগরের মধ্যে এমন একটি প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল সংরক্ষিত হলে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি গবেষণা, শিক্ষা এবং প্রকৃতি পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি হবে। তাই বলা চলে, শিমলা পার্ককে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা ঘোষণা রাজশাহীবাসীর জন্য পরিবেশ সংরক্ষণের এক অভাবনীয় সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে এ সুযোগকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন সকলের দায়িত্বশীল আচরণ। দায়িত্বশীল আচরণ মানে করণীয় ও বর্জনীয় মেনে চলা। সংরক্ষিত এলাকার পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখতে দর্শনার্থীদের জরুরি করণীয় হলো- চলাচলের সময় নীরবতা বজায় রাখা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহযোগিতা করা, বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ এড়িয়ে চলা, ঝড়ে পড়া ডালপালা বা গাছ সংগ্রহ না করা, মে থেকে জুলাই পর্যন্ত বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজনন মৌসুমে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সীমিত রাখার বিষয়টি মেনে চলা, পাখির বাসা নষ্ট না করা, প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে উপভোগ করা, ময়লা-আবর্জনা নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলা, পাখি ও বন্যপ্রাণীর খুব কাছাকাছি না যাওয়া এবং বন্যপ্রাণী শিকার, আবাসস্থল ধ্বংস বা বিরক্ত করার ঘটনা দেখলে স্থানীয় প্রশাসন বা বন বিভাগকে অবহিত করা। আর বর্জনীয় বিষয়গুলো হলো- সংরক্ষিত এলাকায় মাইক, সাউন্ড বক্স বা উচ্চ শব্দে গান বাজানো যাবে না; দলবদ্ধ হইচই বা আলোকসজ্জা করা যাবে না; পলিথিন, প্লাস্টিক ও অপচনশীল বর্জ্য ফেলা যাবে না; পিকনিক, রান্না বা আগুন জ্বালানো যাবে না; পাখি ও বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত বা শিকার করা যাবে না; বৃক্ষ কর্তন কিংবা ডালপালা ধ্বংস করা যাবে না; পার্কের ভেতরে স্থায়ী বা অস্থায়ী দোকান বসানো যাবে না; গবাদিপশুর প্রবেশ ও চরানো সীমিত রাখতে হবে; অপ্রয়োজনীয় শব্দ বা আলো ব্যবহার করা যাবে না; এবং লতা, গুল্ম ও বীরুৎ ধ্বংস বা সংগ্রহ করা যাবে না।
বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা বিরল উদ্ভিদ-প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করতে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গত ৮ জুলাই রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ-এর সভাপতিত্বে জুম প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত এক সভায় রাজশাহীর সর্বসাধারণের প্রতি বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকার সুরক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।